হে মহান পিতা

1

পিতার কাছে চিঠি 

হে মহান পিতা,

আমি তোমার বাংলার একজন খেটে খাওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের বঙ্গসন্তান. তোমার মনে আছে! ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে যেদিন তুমি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলে, সেদিন তুমি কি বলেছিলে? তুমি বলেছিলে, “কবিগুরু বলেছেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি’। কবিগুরুর মিথ্যা কথা আজ প্রমাণ হয়ে গেছে, আমার বাঙালি আজ মানুষ”। পিতা, তোমার সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি আজ ১৭ কোটি। সবাই তোমাকে স্বীকার করেনা। সেসব পিতাহীন সন্তানদের আমি ‘রাও ফরমান আলী অথবা নিয়াজীর সন্তান’ বলে ডাকি।

পিতা, তোমার মঁসিয়ে লালীর কথা তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই? ইংরেজদের কুমন্ত্রণায় ভুলে যাকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা সসৈন্যে নির্বাসিত করেছিলেন ভাগলপুরে। যাবার আগে অশ্রুসজল নেত্রে লালী বলেছিলেন, “নবাব! আপনি রাজনীতির ভুল পথে পা বাড়ালেন”।

ঘাতকেরা ভেবেছিল তোমাকে মেরে ফেলে বুঝি সাড়ে ৩ হাত মাপের একখণ্ড জমিতে তোমাকে বন্দি করা যাবে। কিন্তু ওরা বোধহয় জানতো না, তোমার চেতনা ছড়িয়ে আছে সারা বাংলার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের পবিত্র ভূমিতে। ওরা বোধহয় জানতো না, বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ!
যার জন্য ১৫ আগষ্ট সপরিবারে তোমাকে নৃশংসভাবে খুন করে তোমার ‘রাষ্ট্রপতি’ পদটি দখল করেই শান্ত থাকেনি, তোমাকে যারা খুন করেছে তাদের কোনো দিন বিচার করা যাবে না- এই মর্মে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সও জারি করে মোশতাক!
এই মোশতাকের কুমন্ত্রণায় ভুলে তুমি কাদের নির্বাসিত করেছিলে মনে আছে তোমার? তাদের মধ্যে কেউই কিন্তু মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দেননি সেদিন। জেলখানায় জীবন দিয়েছেন, তবু তোমাকে অসম্মান করে ঘাতকদের সাথে হাত মেলাননি।আজ তাদেরকে
‘জাতীয় চার নেতা’ বলে ডাকা হয়,
বাংলার সাধারণ মেহনতি মানুষ তাদেরকে
‘জাতীয় চার নেতা’র সম্মান দিয়েছে।

পিতা মুজিব, লর্ড ক্লাইভ যেমন ক্ষমতার লোভ দেখিয়েছিল নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফরকে বস করেছিল, তেমনি মোশতাকও হাত মিলিয়েছিল ‘উপ-সেনাপ্রধান’ কালো চশমাধারী জিয়ার সাথে। পলাশীর লর্ড ক্লাইভ এবং খন্দকার মোশতাক আলাদা কেউ নয়।
মনে আছে তোমার? ভাঙা ঘর জোড়া লাগানোর সময় তুমি বেগম খালেদাকে নিজের মেয়ে বলেছিলে আর জিয়াকে নিজের স্নেহধন্য জামাতা বানিয়েছিলে? খালেদাকে যেন ভালো রাখে সে জন্য তুমি সেনাবাহিনীতে ‘উপ-সেনাপ্রধান’ নামে একটি পদ তৈরি করেছিলে এই জিয়ার জন্য। সেই জিয়া ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি যখন জেনেছিল তখন পরিকল্পনাকারীদের পরিকল্পনাকে উস্কে দিয়ে বলেছিল, “আমি সিনিয়র হিসেবে কিছু করতে পারবো না। তোমরা ইয়ং অফিসার, পারলে কিছু করো”। সেদিন জিয়ার ভূমিকা পরিচ্ছন্ন হলে আমরা হয়তো তোমাকে হারাতাম না।
আর বাকি রইলো তোমার সেই ‘মেয়ে’ খালেদার কথা….
সে এখন কি করে জানো??
প্রতিবছর তোমার-ই মৃত্যু দিবসে মিথ্যা জন্মদিন উৎসব উদযাপন করে উল্লাসে মেতে উঠে। কাকে তুমি ‘কন্যা’ বানিয়েছিলে?তার চোখের সামনে কি তখন তোমার শিশুপুত্র রাসেলের মুখটা একবারও ভেসে উঠে না?তোমারই নিজ হাত গড়া সোনার বাংলা বিক্রি করে রাজ্য গড়ে তুলেছে কানাডায় । তার কি একবারও মনে পরে না বঙ্গবন্ধু তাকে মেয়ের আসেন বসিয়ে ছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা আমি কিভাবে বিক্রি করে দিচ্ছি?
তোমার কি মনে পরে যেদিন কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে তোমাকে হত্যা করবার একটি পরিকল্পনার কথা ফাঁস করেছিলেন মেজর মুজিব নামে এক অফিসার। তুমি‌ সে কথায় কর্ণপাত না করে উল্টো কর্ণেল তাহেরসহ অন্য ষড়যন্ত্রকারীদের পদন্নোতি দিয়েছিলে। তারপর সেই মেজর মুজিবকেও চাকুরি থেকে বের করে দিয়েছিলে। মাত্র দুইজন ছাড়া বাকি সবাই ই ক্লাইভের সাথে হাত মিলিয়েছিল নবাবের লোকেদের মধ্যে । আর তোমার সময়ের ৩০০ সদস্যের মধ্যে মাত্র ১২ জন সাংসদ মোশতাকের অবৈধ সংসদে যোগ দান করেনি!
‘বাকশাল’ নামে সমাজতন্ত্র এনেছিলে তুমি বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া কৃষক-শ্রমিকদের জন্য। এই ‘বাকশাল’ নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিরা যে মিথ্যা প্রোপাগান্ডার ছড়িয়ে ছিল তার জবাবে তোমার দল আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্যরা কেউই
গর্জে উঠে না। ‘মুজিববাদ’ নিয়ে তারা কেউ কোন কথা বলেনা। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল তোমার প্রিয়ভাজন ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক সচিব কিংবা সংসদ সদস্য।
ঘাতকেরা সেদিন সংখ্যায় খুুব বেশি ছিলনা। তোমার নিজ হাতে গড়া ‘রক্ষীবাহিনী’ সেদিন ঘাতকদের গোলাবারুদবিহীন ফাঁকা ট্যাংকের সামনে আত্মসমর্পণ করেছিল কোনরকম প্রতিরোধ ছাড়াই। সেদিন যদি রক্ষীবাহিনী একবার শুধু একবার প্রতিঘাত করতো, ঘাতকের দল গর্ত খুঁড়ে পালিয়ে কুল পেতো না।
তোমার ৩২ নাম্বারের বাড়ি থেকে সেদিন মাত্র ৩০ মিনিটের দূরত্বে ছিল তোমার আস্থাভাজন রক্ষীবাহিনী।
ফাঁকা হাতে বিশ্বাসঘাতকতা আর ষড়যন্ত্রের দাবাখেলায় লর্ড ক্লাইভের মতো ঘাতকরাও সেদিন সর্বস্ব বাঁজি রেখেছিল।
পলাশীর প্রান্তে সেদিন সেনাপতি মোহনলাল এবং মীর মদন ছাড়া আর কেউই এগিয়ে আসেনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে গিয়ে নবাবকে রক্ষা করতে। তেমনি তোমাকে রক্ষায় ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারে সেদিন ছুটে গিয়েছিল কর্নেল জামিল নামে এক অকুতোভয় সেনা কর্মকর্তা। একা, তাও আবার খালি হাতে।
বাংলার মানুষের হয়ে স্বাধিকার আন্দোলন করতে গিয়ে তুমি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন পাকিস্তানের কারাগারে কাটিয়েছিলে, ৯ মাসে একটা বাচ্চার জন্ম হয়না, অথচ একটা দেশের জন্ম দিয়েছিলে যেই‌ তুমি, ‌সেই তুমি কে স্বাধীন দেশে ওরা তোমায় ১৩ শত ২৩ দিনের বেশি বাঁচতে দিলো না।

পিতা আমার, তবে জানো কি তোমাকে সাড়ে তিন হাত মাটির মধ্যেই সীমিত রাখার যে ষড়যন্ত্র ওরা করেছিলো তা আজ সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বাংলার ১৭ কোটি প্রাণে প্রতিদিন তুমি ধ্বণিত হও পুরুষোত্তম পিতারুপে।
পিতা তোমার মনে আছে কি তোমার ‘হাচু’র কথা?? বহুবার বলেছো তুমি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ আর ‘কারাগারের রোজনামচা’য়। শিশু জহুরা সেদিন ইংরেজ বেনিয়াদের কাছ থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে না পারলেও তোমার হাচু ২১ বছর বিলম্বে হলেও কিন্তু ঠিকি স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে হটিয়ে আবার বাংলার মসনদে বসেছিল, তার হাতেই তোমার সোনার বাংলা সবচাইতে বেশি নিরাপদ।শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকা অবস্থায় আমি আছি তোমার হাচু এর সাথে যাতে স্বাধীনতাবিরোধ চক্র আর বাংলার মসনদে না বসতে পারে..
ভাল থেকো পিতা, হে বাঙ্গালী জাতির পিতা ক্ষমা করো আমাদের।

জাহিদ আহমেদ (ম্যাক্স)
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হল।
সার্বিক সহযোগিতায় – মাহামুদুল হাসান (সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক – বাংলাদেশ ছাত্রলীগ)

 

1 টি মন্তব্য
  1. ফারুক বলেছেন

    অসাধারণ! 😍😍😍😍😍

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

%d bloggers like this: