অনন্তলোকে সংগীতসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর

0

‘বড় শূন্য শূন্য দিন/ সুরহীন, তালহীন, কালহীন/…জীবন মরণ মিলে মিশে গেছে/ কিছু তো নাই রঙিন’- এমন শূন্য, সুর-তালহীন, বর্ণহীন দিন বোধ করি স্মরণকালের মধ্যে আসেনি এ উপমহাদেশের ৩৬টি ভাষাভাষী মানুষের জীবনে। বিরহজাগানিয়া যে সুরধারা তাদের উদ্বেলিত করে প্রাণস্রোতে ভাসিয়ে দিত; উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা হয়ে যে কণ্ঠস্বর তাদের প্রশান্তির সন্ধান দিত; সেই সুর ও স্বরের মানুষ লতা মঙ্গেশকর স্তব্ধ হয়ে গেছেন গতকাল রোববার সকালে। স্মৃতিমেদুর সংগীতশিল্পী কৌশিকী চক্রবর্তীর ভাষায়, ‘সরস্বতী ঠাকুরের কখনও বিসর্জন হবে- ভাবিনি; কখনও চিন্তার মধ্যে ছিল না।’ তাই গভীর বিষাদ ছড়িয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষের মনে।

দীর্ঘ অসুস্থতার পর গতকাল রোববার সকাল ৮টা ১২ মিনিটে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছেন চিরনবীনা সংগীতশিল্পী লতা। সবার হৃদয়ে গভীর বিষাদ ছড়িয়ে চলে গেছেন অনন্তলোকে। কভিড ও নিউমোনিয়ার ধকল আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি ৯২ বছর বয়সী এ শিল্পী।

‘নাইটিঙ্গেল’, ‘সুরের সরস্বতী’, ‘কিংবদন্তি ‘ বা ‘সুরসম্রাজ্ঞী’- যে বিশেষণই যুক্ত করা হোক না কেন; একজন পরিপূর্ণ লতা মঙ্গেশকরকে অনিঃশেষ অখণ্ডতায় আবিস্কার করা সহজ নয়। বাংলা ও হিন্দি গানের গৌরবময় ইতিহাসের স্বর্ণালি অধ্যায় অনেক গায়ক-গায়িকার আগমনে উজ্জ্বল হয়েছে। কিন্তু এই অনেকের ভিড়ে লতা মঙ্গেশকর একেবারেই স্বতন্ত্র। তার অসামান্য সুরমাধুর্যে তিনি চিরঅমরত্বের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত। বাংলা ও হিন্দি সংগীতের স্বর্ণযুগের এ শিল্পী সাত দশকেরও বেশি সময়জুড়ে উপমহাদেশের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সুর-গায়কিতে তন্ময় করে রেখেছেন। ভাবিকালের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরেও তার গান অনিঃশেষ আনন্দ ও বেদনার সঙ্গী হয়ে থাকবে।

চিকিৎসক প্রতীত সামধানি জানিয়েছেন, মাল্টি অর্গান ফেইলিউর বা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বহুমাত্রিক নিস্ক্রিতায় এ কিংবদন্তির মৃত্যু হয়েছে। তার মৃত্যুতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তো বটেই, সর্বত্র নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শোক প্রকাশ করেছেন দেশ-বিদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও অগণিত অনুরাগী। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কিংবদন্তি সংগীতশিল্পীর মৃত্যুতে পৃথকভাবে গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণে ভারতে দু’দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ সোমবার অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আগামী ১৫ দিন রাজ্যে বাজবে লতার গাওয়া গান- জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

লতা মঙ্গেশকরের অসুস্থতার খবর গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই উৎকণ্ঠিত ছিল সারাবিশ্বের কোটি কোটি বাঙালিসহ অজস্র সংগীতপ্রেমী। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে সব বয়সী অনুরাগী তার জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন এ সময়। কিংবদন্তি এ গায়িকার মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শোকে মুহ্যমান। শিল্পী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক প্রকাশ করছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

অন্তিম যাত্রা: মুম্বাই শহরবাসী যখন শীতঘুম ছেড়ে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই সবার ঘরে পৌঁছে যায় হৃদয়বিদারক দুঃসংবাদটি- গানের স্বপ্নচারিণী মর্ত্যজগতে আর নেই। তাকে শেষবারের মতো দেখতে মুহূর্তেই ভিড় জমতে শুরু করে হাসপাতাল চত্বরে। ততক্ষণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়।

দুপুরে লতার প্রাণহীন দেহ নিয়ে শেষবারের মতো তার নিজের বাড়ি ‘প্রভাকুঞ্জ’তে প্রবেশ করে শববাহী গাড়িটি। সেখানে উপস্থিত হন বলিউড অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনসহ আরও অনেকে। সেখানে কয়েক ঘণ্টা মরদেহ রাখার পর চিরবিদায়ের জন্য নেওয়া হয় মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে। সেখানে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় লতা মঙ্গেশকরের মরদেহে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর পর একে একে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শাহরুখ খান, শচীন টেন্ডুলকার, জাভেদ আখতার, রাজ ঠাকরেসহ বিশিষ্টজন।

লতার এ শবযাত্রা ও আধা ঘণ্টাব্যাপী শেষকৃত্যে শামিল হন অজস্র মানুষ। প্রত্যেকেরই প্রতীক্ষা তখন শেষ বিদায়ের সাক্ষী হয়ে ওঠার। লতা মঙ্গেশকরের মরদেহ কফিন থেকে বের করে চন্দন কাঠের সারিতে সাজানো হয় তার শেষ শয্যা। শেষ শয্যা আগুনের ছোঁয়া পেতেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর তার মুখাগ্নি করেন। সেই আবেগঘন মুহূর্তে কেউই নিজেকে সামলাতে পারেননি। অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠেন অনুরাগী-ভক্ত-স্বজন সবাই।

গত ৮ জানুয়ারি লতা মঙ্গেশকরের করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে। পরে জানা যায়, কভিডের পাশাপাশি এই কিংবদন্তি নিউমোনিয়াতেও আক্রান্ত হন। টানা ২৮ দিন মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। মাঝে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ভেন্টিলেশন থেকে সরানো হয়। কিন্তু গত শনিবার আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পুনরায় ভেন্টিলেশন দেওয়া হয় তাকে। গতকাল ভোর থেকে চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় মেডিকেল সহযোগিতাসহ চেষ্টার ত্রুটি না রাখলেও লতা চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

সূত্র: সমকাল

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

%d bloggers like this: